জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দুপুরের লাঞ্চ বিল ১১৩ কোটি টাকা, অডিটে আপত্তি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৬-১০-২০২৬ ০২:০৪:১৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৬-১০-২০২৬ ০২:০৪:১৫ অপরাহ্ন
বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, তীব্র মূলধন সংকট আর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে ধুঁকছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ঋণ কেলেঙ্কারি আর লুটপাটের ধাক্কায় ব্যাংকটি যখন সাধারণ আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষা দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেই সময়েও ব্যাংকের টাকায় নিজেদের পকেট ভরাতে দ্বিধা করেননি ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। একদিকে লোকসানে থাকা ব্যাংকের ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে বোনাসের নামে কর্মকর্তারা ভাগ করে নিয়েছেন ১৫৩ কোটি টাকা, অন্যদিকে সরকারি আইন লঙ্ঘন করে দুপুরের খাবারের (লাঞ্চ সাবসিডি) নাম করে তুলে নিয়েছেন আরও ১১৩ কোটি টাকা।
সরকারি এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জনতা ব্যাংকের এমন আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি তহবিল ভাগবাটোয়ারার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু কর্মকর্তাদের নীতিবহির্ভূত লাঞ্চ সুবিধা ও বোনাস দেওয়ার নামেই কর্মকর্তাদের পকেটে গেছে ব্যাংকটির মোট ২৬৬ কোটি ৫০ লাখ ৩৩ হাজার ৩১১ টাকা। আর এটি এমন এক সময়, যখন ব্যাংকটি লোকসানে ধুঁকছে।
সম্প্রতি নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে করা জনতা ব্যাংকের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এবং চাকরি আদেশ-২০১৫ তোয়াক্কা না করে ব্যাংকের এসব আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে।
ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে ১৫৩ কোটি টাকার বোনাস: বাণিজ্যিক অডিটের নথি অনুযায়ী, কাগজে-কলমে কাল্পনিক ও ভুয়া মুনাফা দেখিয়ে ২০২৩ সালে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৩ দশমিক ৭৫ গুণ হারে বিশাল অঙ্কের উৎসব ও উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ব্যাংক তহবিল থেকে তুলে নেওয়া হয় মোট ১৫৩ কোটি ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫৪ টাকা। তবে এ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে মানা হয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত (খেলাপি) ঋণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং প্রভিশন ঘাটতি থাকায় ব্যাংকটিতে কোনো মুনাফা অর্জিত হয়নি। বাস্তবে ব্যাংকটি তখন লোকসানে নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু অডিট এড়াতে ও কর্মকর্তাদের পকেট ভারী করতে পরিচালনা পর্ষদের ৮২০তম সভায় ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র গোপন রাখা হয়।
অডিট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তাদের উৎসাহ বোনাস দিতে চাইলে চূড়ান্ত মূল্যায়নে ব্যাংকের স্কোর ন্যূনতম ৫০ হতে হবে। কিন্তু জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত আর্থিক ও পরিচালন মূল্যায়নে প্রাপ্ত স্কোর ছিল মাত্র ৩৫। স্কোর ৫০-এর নিচে নামলে কোনো কর্মকর্তা এক টাকাও বোনাস পাওয়ার যোগ্য নন। কিন্তু জনতা ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সরকারের এ বাধ্যবাধকতাকে তোয়াক্কা করেনি।
এ ছাড়া, সরকারি নির্দেশনাবলি অনুযায়ী বোনাস দেওয়ার পূর্বশর্ত হলো ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা অর্জন। কিন্তু নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ব্যাংকটিতে মোট ২১ হাজার ১৮১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও জনতা ব্যাংক রাখতে পেরেছিল মাত্র ৫ হাজার ৮৩৫ কোটি ৪ লাখ টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৩৪৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ বিশাল ঘাটতি গোপন রেখে কাগজে-কলমে ৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা মুনাফা দেখানো হয়। একই সময়ে ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত ঋণ ২০২২ সালের ১৫ হাজার ৭৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ২৪ হাজার ৮৯৬ কোটি ২৮ লাখ টাকায় পৌঁছায়।
নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চূড়ান্ত স্কোর ৫০-এর কম হওয়া এবং প্রভিশন ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এ বোনাস প্রদান ছিল নিয়মবহির্ভূত। প্রভিশন ঘাটতি গোপন করে ভুয়া মুনাফার ভিত্তিতে বোনাস বিতরণ শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, এটি ব্যাংক তহবিলের অপব্যবহারের শামিল। নিরীক্ষা দল এ সমুদয় অর্থ বেআইনি ও অনাদায়ি আর্থিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আদায় করে ব্যাংক কোষাগারে জমা করার সুপারিশ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জনতা ব্যাংকের আর্থিক সংকটের বড় কারণ খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি। ২০২৫ সালের জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ৭২ হাজার ৫৩৯ কোটি এবং ২০২৬ সালের জুনে ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে রয়েছে।
খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত হিসাবে জনতা ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৫৫ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির নিট লোকসান হয় ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুনে যা হয়েছে ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা, যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
ব্যাংকটির মূলধন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক।
২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মূলধন ঘাটতি ছিল ১৮ হাজার ৩৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট জনতা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।
সরকারি আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১১৩ কোটি টাকার ‘লাঞ্চ’ বিলাস: এদিকে কর্মকর্তাদের শুধু অনৈতিক বোনাস দিয়েই থেমে থাকেনি জনতা ব্যাংক, বেআইনি লাঞ্চ সাবসিডির নামেও ব্যাংকের বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একদিকে যখন ভুয়া মুনাফায় বোনাসের ভাগবাটোয়ারা চলছিল, অন্যদিকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দুপুরের খাবারের নামে বিশেষ সুবিধা দিতে চালু করা হয় ‘লাঞ্চ সাবসিডি’। সরকারি বেতন কাঠামো এবং পে-অর্ডারের তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে ব্যাংকের হাজার হাজার কর্মকর্তাকে দুপুরের খাবারের ভাতা বা লাঞ্চ সাবসিডি দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা নির্ধারিত হয় সরকারি ‘চাকরি (ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান) (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ-২০১৫’ অনুযায়ী। উক্ত আদেশের ২০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ব্যাংকের ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা কাজের বিপরীতে মাসিক ২০০ টাকা হারে টিফিন ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবেন। এর বাইরে ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের কোনো কর্মকর্তা লাঞ্চ সাবসিডি বা দৈনিক খাবারের ভাতা পেতে পারেন না এবং দৈনিক ভিত্তিতে তা প্রদানের কোনো আইনি সুযোগ নেই।
কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে সরকারি বেতন আদেশের ২০ অনুচ্ছেদ অমান্য করে ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ৪০৬তম সভায় ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের সব কর্মকর্তার জন্য প্রতিদিনের ‘লাঞ্চ সাবসিডি’ অনুমোদন করা হয়। এ সিদ্ধান্তের ফলে পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি অনুযায়ী প্রতিদিন ২০০ টাকা হারে এ অর্থ দেওয়া হয়। পর্ষদের ওই সিদ্ধান্তের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে ব্যাংকের কোষাগারের বিপুল অঙ্কের টাকা। কেবল এ নিয়মবহির্ভূত লাঞ্চ সাবসিডি বাবদ ব্যাংকটির ব্যয় হয়েছে ১১৩ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫৭ টাকা। অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যাংকের কোনো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রীয় আইন বা সরকারি আদেশ লঙ্ঘন করে নিজস্ব কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা অনুমোদন করতে পারে না। ফলে এই ১১৩ কোটি টাকার ব্যয় বেআইনি ও অপব্যয় হিসেবে গণ্য হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি ব্যাংকের যখন মূলধন ঘাটতি থাকে, খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ে, তখন ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মচারীদের কৃচ্ছ্রসাধনের পথ অবলম্বন করার কথা। অথচ জনতা ব্যাংকের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে আইন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অডিট পর্যালোচনায় জানা যায়, অডিট দল যখন এসব বিষয়ে ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চায়, তখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে জবাব দিয়েছে, তা অডিটের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। বোনাসের বিষয়ে ব্যাংক জানিয়েছে, তারা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ হিসাব ও পর্ষদ অনুমোদনের ভিত্তিতে বোনাস দিয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষা বলছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট স্কোর (৫০) না পাওয়া এবং ব্যাংকে বিপুল প্রভিশন ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এ জবাব গ্রহণযোগ্য নয়।
লাঞ্চ সাবসিডির বিষয়ে ব্যাংক জানিয়েছে, পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা বাড়াতে এ ভাতা দেওয়া হয়েছে। তবে অডিটে ব্যাংকের এ জবাবকে ‘স্বীকৃতিমূলক অনিয়ম’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি আদেশ-২০১৫-এর অনুচ্ছেদ ২০ লঙ্ঘন করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কোনো ভাতা অনুমোদন করতে পারে না এবং এটি সরকারি কোষাগার থেকে অবৈধভাবে অর্থ তুলে নেওয়ার শামিল।
অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, যখন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক খেলাপি ঋণের চাপে সংকটে রয়েছে, তখন কর্মকর্তাদের এমন বোনাস ও ভাতা গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কৃত্রিম মুনাফা দেখিয়ে বোনাস দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তারা মনে করেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মজিবর রহমান বলেন, পরিচালনা বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই বোনাস এবং লাঞ্চ সাবসিডি দেওয়া হয়েছে। এটা দীর্ঘদিন ধরেই চলমান, অন্যান্য ব্যাংকেও এর প্রচলন রয়েছে। অডিট অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যাংকের কাজের ধরন মিলিয়ে আপত্তি তুলেছে। অথচ বোনাস ও লাঞ্চ ভাতার পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদিত এবং দেশের সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অডিট অধিদপ্তরকে দেওয়া ব্যাখ্যায় জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ৮২০তম সভার অনুমোদনক্রমে ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যমান কর্মস্পৃহা ও কর্মউদ্দীপনা অটুট রাখাসহ ভবিষ্যতে তাদের ব্যাংকের সার্বিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকাজে স্বপ্রণোদিত অংশগ্রহণে অধিকতর অনুপ্রাণিত ও উৎসাহ জোগানোর লক্ষ্যে ২০২৩ সালের জন্য সংরক্ষিত প্রভিশন থেকে ৩ দশমিক ৭৫ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ উৎসাহ বোনাস হিসেবে প্রদান করা হয়েছে।
লাঞ্চ সাবসিডির বিষয়ে ব্যাংকটি জানিয়েছে, জনতা ব্যাংকের সব গ্রেডের কর্মচারীদের অনুকূলে কল্যাণমূলক স্কিমের অধীন লাঞ্চ ও হালকা নাস্তা বাবদ সাবসিডি প্রদান করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের ২৫২তম সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য তিনটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লাঞ্চ সাবসিডি ও হালকা নাস্তা খরচ বাবদ ২০০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলমান লাঞ্চ ও হালকা নাস্তা বাবদ সাবসিডি খরচের বিষয়টি চাকরি আদেশ-২০১৫-এর ২০ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ‘টিফিন ভাতার’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উক্ত অনুচ্ছেদে ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডের কর্মচারীদের মাসিক ২০০ টাকা টিফিন ভাতা প্রাপ্যতার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। সেই হিসেবে যদি কর্মচারীদের টিফিন ভাতার সঙ্গে লাঞ্চ সাবসিডি ও হালকা নাস্তা বাবদ ২০০ টাকা দেওয়া হতো, তাহলে চাকরি আদেশের পরিপন্থী হতো। এক্ষেত্রে বেতন ও বিভিন্ন ভাতাদির সঙ্গে লাঞ্চ ও হালকা নাস্তা বাবদ সাবসিডির বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রভিশন ঘাটতি থাকার পরেও কীভাবে তারা কর্মকর্তাদের বোনাস দিয়েছে এবং কী যুক্তিতে লাঞ্চ সাবসিডি দিয়েছে, সেটার জবাব জনতা ব্যাংকই ভালো দিতে পারবে। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক অডিট আপত্তি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া; কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করবে না। সংশ্লিষ্ট জনতা ব্যাংককেই অডিট অধিদপ্তরকে সন্তোষজনক জবাব দিতে হবে। তবে রুটিন পরিদর্শনে বাংলাদেশ ব্যাংক অডিট ফাইল এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপ খতিয়ে দেখে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে বোনাস নেওয়ার সুযোগ নেই। এই অডিটে যে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আমরা আসার আগেই হয়েছে। তবে এখন আর এভাবে ইনসেনটিভ দেওয়া হয় না। এখন যাতে আগের মতো অনিয়ম না হয়, সেটি নিশ্চিতের পাশাপাশি আগের ক্ষতিগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বোনাস-লাঞ্চের নামে ২৬৬ কোটি টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করে কর্মকর্তাদের এভাবে বোনাস ও ভাতা দেওয়া সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম এবং জনগণের অর্থের সঙ্গে প্রতারণা। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য ব্যাংকও নেয়’—জনতা ব্যাংকের দেওয়া এমন যুক্তিও অযৌক্তিক। একটি অপরাধ কখনোই অন্য কোনো অপরাধকে বৈধ করতে পারে না। অনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণকারী কর্মকর্তা—সবাইকে জবাবদিহির আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা উচিত।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স